বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ প্রান্তে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবির) গৌরবময় ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে।
সোমবার (২৭ অক্টোবর) সকাল থেকে দিন ব্যাপী টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবির) সদর দপ্তরে অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বর্ণাঢ্য আয়োজনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কেক কাটা, প্রীতিভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার রিজিয়নের রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোঃ মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন- “বিজিবি শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনী নয়, এটি জাতির গর্ব। টেকনাফ ব্যাটালিয়ন তাদের দায়িত্ব পালনে যে নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেম প্রদর্শন করেছে- তা সত্যিই অনুকরণীয়। সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও ২ বিজিবি অন্য ইউনিটগুলোর জন্য দৃষ্টান্ত।”
অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন র্যাব-১৫ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসান। তিনি বলেন- “দেশের দক্ষিণ সীমান্তে মাদক ও মানবপাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজিবির অবদান অনস্বীকার্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিজিবি, র্যাব ও অন্যান্য বাহিনীর সমন্বিত পদক্ষেপ দেশকে আরও নিরাপদ করে তুলবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৪৮ সালের ২৭ অক্টোবর ময়মনসিংহের খাগডহরে যাত্রা শুরু করা এই ঐতিহ্যবাহী ব্যাটালিয়ন দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের সীমান্ত সুরক্ষা, মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
দেশের ৪,৪২৭ কিলোমিটার সীমান্তরেখা জুড়ে “সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী” হিসেবে বিজিবির এই ইউনিট দায়িত্ব পালন করছে নিরলসভাবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের বীর সেনানীদের উত্তরসূরি হিসেবে ২ বিজিবি ইতোমধ্যে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবপ্রাপ্ত বীরদের উত্তরাধিকার বহন করছে। ১৯৯৯ সালে ব্যাটালিয়নটি অর্জন করে ‘বাংলাদেশ রাইফেলস্ স্ট্যান্ডার্ড পদক’, যা তাদের ইতিহাসে এক অনন্য সম্মান।
২০১৫ সালের ১৫ নভেম্বর টেকনাফে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ব্যাটালিয়নটি সীমান্ত সুরক্ষা, মাদক প্রতিরোধ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় একের পর এক সাফল্যের নজির স্থাপন করেছে।
গত এক বছরে (১ অক্টোবর ২০২৪ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত) টেকনাফ ব্যাটালিয়নের অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে ১৭৯ জন আসামি, উদ্ধার হয়েছে ২.০৮৮০৩ কেজি স্বর্ণ ও ৪.২০৬ কেজি ক্রিস্টাল মেথ আইস, এবং ৫৭ লক্ষাধিক ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে। এছাড়াও দেশি-বিদেশি অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ বিপুল পরিমাণ চোরাচালান সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২১৮ কোটি ২৪ লাখ ৯৮ হাজার টাকা।
শুধু মাদকবিরোধী অভিযানই নয়—মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও ২ বিজিবি রেখেছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত এক বছরে ব্যাটালিয়নটি অপহৃত ৩৮৭ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার, ৮৭ জন মানবপাচারকারীকে আটক, এবং আরাকান আর্মির কাছে আটক ১২৪ জন বাংলাদেশি জেলেকে নিরাপদে ফেরত আনতে সফল ভূমিকা রাখে।
এছাড়াও মিয়ানমারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রেখে ৩৪ জন বিদেশি নিরাপত্তা সদস্যের নিরাপদ প্রত্যাবাসনও নিশ্চিত করেছে এই ব্যাটালিয়ন।
সামাজিক ও মানবিক সহায়তায়ও টেকনাফ ব্যাটালিয়নের অবদান প্রশংসনীয়। বিগত বছরে তারা ৪৪০ জনকে শীতবস্ত্র বিতরণ, ৮টি মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে ১,০৯৭ জনকে চিকিৎসা সহায়তা এবং প্রায় ১,০০০ জন প্রান্তিক অসহায় মানুষকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেছে।
টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি) আজ দেশের সীমান্তরক্ষার অগ্রভাগে থেকে “অপ্রতিরোধ্য শক্তি” হিসেবে গর্ব ও জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন “যতদিন উড়বে লাল-সবুজ পতাকা, ততদিন আমরা দেশের সর্বদক্ষিণ সীমান্তের দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে থাকব। আমাদের বীর পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগ ও সহকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই আজ টেকনাফ ব্যাটালিয়ন এই মর্যাদায় আসীন। আমরা শপথ নিয়েছি, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধা করব না।”
তিনি আরও বলেন “দেশ মাতৃকার সেবায় নিরলসভাবে কাজ করে বিজিবি হয়ে উঠবে সীমান্তে নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক।”
অনুষ্ঠানে বিজিবি কক্সবাজার রিজিয়নের রামু সেক্টরের আওতাধীন ১১, ৩০, ৩৪ ও ৬৪ ব্যাটলিয়নের অধিনায়কগণ, ১৬ এপিবিএনের সহ অধিনায়ক, গোয়েন্দা সংস্থার পদস্থ কর্মকর্তাগণ ও নানা শ্রেণি পেশার ব্যক্তিবর্গরা উপস্থিত ছিলেন।